মো. ফারুক, পেকুয়া;

জুলাই আন্দোলনে চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ ওয়াসিম আকরামের স্মৃতি আজও তাড়িয়ে বেড়ায় তাঁর পরিবারকে। বিশেষ করে পিতা শফিউল আলম এখনও বিশ্বাস করতে পারেন না যে পরিবারের সেই স্বপ্নবাজ ছেলেটি আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। সম্প্রতি এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ছেলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনের শহীদ পরিবারগুলোর টেকসই পুনর্বাসন, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, বিচারপ্রক্রিয়া এবং বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নিজের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এসব বিষয়ে তাঁর আস্থা ও ভরসা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর।

শফিউল আলম বলেন, ওয়াসিম পরিবারের প্রতি অত্যন্ত দায়িত্বশীল ছিল। ভবিষ্যৎ নিয়ে তার অনেক পরিকল্পনা ছিল। পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন এবং বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটানোই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য।

তিনি জানান, ওয়াসিমের বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল এবং সে আগেই পাসপোর্ট করে রেখেছিল। প্রায়ই বলত, বিদেশে যেতে পারলে পরিবারের জন্য কিছু করতে পারবে, মায়ের হাতে টাকা তুলে দিতে পারবে এবং সংসারের দায়িত্ব ভাগ করে নিতে পারবে। এসব কথা শুনে পরিবারও নানা স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর বাস্তবে রূপ নেয়নি।

ছেলের স্মৃতি স্মরণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমার ছেলে বিভিন্ন সময় এমন কিছু কথা বলত, যেগুলো এখন মনে হলে মনে হয় সে আমাকে অনেক কিছু বোঝাতে চেয়েছিল। তখন হয়তো সেসব কথার গভীরতা বুঝতে পারিনি। একজন বাবা হিসেবে যদি বুঝতে পারতাম, তাহলে আরও বেশি সময় ওর সঙ্গে কাটাতাম। আজ সেই আফসোস আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।”

শফিউল আলম জানান, একদিন হঠাৎ ছেলে তাকে ফোন করে জানায় যে সে ভারতে গিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে।

তিনি বলেন, “আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। কারণ আমার ছেলে রাজনীতি করত—এ বিষয়টি আমি আগে জানতাম না। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, পাসপোর্ট কোথায় পাবে? তখন সে জানায়, আগেই পাসপোর্ট করে রেখেছে। এরপর বলেছিল, ‘শেষবারের মতো সাহেবকে একটু দেখে আসি।’ কেন সে ‘শেষবার’ কথাটি বলেছিল, তা আমি তার শহীদ হওয়ার পর বুঝতে পেরেছি।”

চট্টগ্রামে আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ওয়াসিম তার দুই বন্ধুর কাছে বাবার মোবাইল নম্বর দিয়ে খবর দিতে বলেছিল বলে জানান শফিউল আলম।

তিনি বলেন, “ওর এক বন্ধু আমাকে ফোন করে জানায়, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মিছিলে আমার ছেলেকে গুলি করা হয়েছে। ছেলেকে হারানোর ব্যথাটা আজও বুকের মধ্যে জমে আছে। আমার তো দুই ছেলে ছিল, একটি চলে গেছে, আরেকটি আছে। কিন্তু যাদের একমাত্র সন্তান ছিল, তারা কীভাবে নিজেদের সান্ত্বনা দেন, সেটি ভাবলেও কষ্ট হয়।”

তিনি আরও বলেন, “আমার মনে হয়, ছেলেকে যদি দ্রুত ও যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া যেত, তাহলে হয়তো সে বেঁচে যেত।”

শফিউল আলম জানান, শহীদ হওয়ার পর বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কিছু আর্থিক সহায়তা পেয়েছিলেন।

তিনি বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উৎস থেকে প্রায় সাত লাখ টাকা সহায়তা পেয়েছি। এছাড়া ছোট ছোট কিছু অনুদান এসেছে। তবে একজন সন্তান হারানোর ক্ষতি অর্থ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।”

শহীদ পরিবারের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে শফিউল আলম বলেন, “আমাদের মূল্যায়ন কে করল বা না করল, সেটি বড় বিষয় নয়। আমরা কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা ব্যক্তির কাছ থেকে মূল্যায়ন প্রত্যাশা করি না। আমাদের বিশ্বাস, মানুষের প্রকৃত মূল্যায়ন মহান আল্লাহর কাছেই রয়েছে। মানুষের দেওয়া স্বীকৃতির চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিই আমাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

আন্দোলনে আহত ও নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের পুনর্বাসন বিষয়ে তিনি বাস্তবমুখী কিছু প্রস্তাব তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য শুধু ফ্ল্যাট বা নগদ অর্থ দেওয়ার পরিবর্তে নিজ নিজ এলাকায় স্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হলে সেটি আরও কার্যকর ও টেকসই হতো। আমরা আগেও এ ধরনের প্রস্তাব দিয়েছিলাম।”

তিনি আরও বলেন, “একটি পরিবারের একজন সদস্য নিহত বা গুরুতর আহত হলে শুধু আর্থিক সহায়তা দিয়ে সেই ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও জীবিকার বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সক্ষমতার ভিত্তিতে সরকারি চাকরি বা অন্যান্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হোক। তাহলে তারা ভবিষ্যতে স্বাবলম্বী হতে পারবে।”

আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এখনও অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে।

তার ভাষায়, “আমাদের এলাকায় অনেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার আছে। কিন্তু তাদের খোঁজখবর নিতে কিংবা তাদের সমস্যার কথা শুনতে খুব কম মানুষই আসেন। অনুষ্ঠান বা ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবিক সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে শহীদদের আত্মত্যাগের ইতিহাস তুলে ধরতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান শফিউল আলম।

তিনি বলেন, “কোনো পাঠাগার, সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা সরকারি স্থাপনার নাম শহীদদের নামে করা উচিত। যারা দেশের জন্য সত্যিকার অর্থে আত্মত্যাগ করেছেন, রাষ্ট্র ও সমাজের উচিত তাদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়া।”

ছেলের হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “যারা প্রকৃত অপরাধী, তাদের অবশ্যই শাস্তি দিতে হবে। আর যারা নির্দোষ, তারা যেন কোনোভাবেই হয়রানির শিকার না হন। আমার ছেলের হত্যার বিচার যেন সঠিকভাবে হয় এবং প্রকৃত আসামিদেরই বিচার হয়। নিরপরাধ কেউ যেন শাস্তি না পায়।”

সাক্ষাৎকারের শেষদিকে তিনি বলেন, শহীদ পরিবারগুলোর প্রত্যাশা কেবল সহানুভূতি নয়, বরং বাস্তবসম্মত পুনর্বাসন, ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। এসব বিষয়ে তিনি বর্তমান সরকারের সদিচ্ছা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেন।